Paranormal

অদৃশ্য আওয়াজ (পর্ব ২)

 

আবার আরেক শ্রেণীর পাগল আছে যারা এক যায়গায় স্থির হয়ে বসে থাকে এবং এক দৃষ্টিতে কোন কিছুর দিকে তাকিয়ে থাকে।

অনেকের উপর প্রয়োগ করা হয় কবিরাজি চিকিৎসা।শরীরের বিভিন্ন জায়গায় তাবিজ বেঁধে দেওয়া হয়।চলতে থাকে রুটিন মাফিক তেল পড়া পানি পড়া সেবন।নির্দিষ্ট সময়ে কবিরাজ আসবেন ঝাড় ফুঁক করবেন।দুষ্টু জ্বীনকে প্রশ্ন করা হবে কিসের বিনিময়ে সে চলে যাবে।কোন কোন জ্বীন একটা খাশিতেই সন্তুষ্ট থাকবে।আর কিছু জ্বীন আছে লোভী যারা ছয় থেকে সাতটি গরু দাবি করে।
আর কোন কোন জ্বীন আছে যেতেই নারাজ।
সে পরিষ্কার কথায় বলে দেবে-ওকে ছেড়ে আমি যাবো না ওকে আমার ভালো লেগেছে।
তার পর শুরু হবে জ্বীনের উপর নির্যাতন।

তবে ঝাড় ফুঁক দেওয়ার আগে কবিরাজ নিজের শরীর বন্ধ করবে। কেননা দুষ্টু আত্মা বা জ্বীন হলে সেটা কবিরাজের শরীরে ভর করবে।রাতে কবিরাজ কে আক্রমন করবে তিনি অদ্ভুত সব স্বপ্ন দেখবেন এবং স্বপ্নের মধ্যে ভয়ংকর কোন জন্তুর সাথে লড়াই করবেন।তারপরর ঘুম থেকে উঠে দেখবেন উঠুনে একটা প্যাঁচা বা কাক মরে আছে।এবাবে চলতে থাকে কবিরাজের চিকিৎসা।

তবে কী আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি।না,এই ঘটনা কাউকে বলা যাবে না।যদি বলি তাহলে কেউ কেউ বলবে খারাপ জ্বীনে আসর করেছে।আবার কেউ কেউ বলবে হয়ত মাথায় সমস্যা দেখা দিয়েছে, হরমোনের অভাব দেখা দিয়েছে।ভালো ডাক্তারের শরণাপন্ন হও ।এভাবে একের পর এক পরামর্শ আসতে থাকবে।তখন আমার নিজের প্রতি সন্দেহ হবে।আমি নিজেকে প্রশ্ন করব সত্যিই কি আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি।তারপর ধীরে ধীরে নিজের প্রতি বিশ্বাসের দানা বাদবে,যে আমি একজন পাগল।কখনো একা একা দাড়িয়ে হা হা অট্রহাসির রুল তুলবো।যা আমার কাছে স্বাভাবিক মনে হবে কিন্তু আশপাশের লোক গুলা অদ্ভুত দৃষ্টিতে আমার দিতে তাকিয়ে থাকবে,কেউ কেউ আমার সাথে ও হাসবে।কোন চা স্টলের দুষ্টু কর্মচারী গ্লাসের জল ছুড়ে মারবে আমার দিকে।স্কুলের বাচ্চারা পাগল পাগল বলে চেঁচামেচি করবে।দুষ্টু ছেলেরা ঢিল ছুড়ে মারবে,কাঁধা ছুড়ে মারবে।বিয়ে বাড়িতে কিংবা কোন অনুষ্টানে ঢুকলে আমাকে ঘাড় ধাক্ষা দিয়ে বের করে দেওয়া হবে।
কথা গুলো ভাবতে ভাবতে কেমন যেন শিওরে উঠলাম,শরীর কাঁপুনি দিয়ে উঠলো।প্রতিটা লোম খাড়া হয়ে গেল।

সিগারেট প্রায় শেষের দিকে।জানালার বাইরের দিকে তাকিয়ে তারিনের কথা ভাবছিলাম।এই সেই তারিন যার মায়ায় পড়েছিলাম।একটু আগে যার মৃদু হাসির স্বর শুনেছি,স্পষ্ট ভাবে।যেন তারিন খুব কাছে বসে হাসছে।কিন্তু আমি তো ওর সাথে প্রেম করিনি।এমন তো না যে আমি ওর কাছ থেকে বড় ধরনের কোন আঘাত পেয়েছি।তাছাড়া ওকে তো মনেই পড়ে না,প্রায় ভুলে গেছি।তাহলে এমন ঘটবে কেন?
ভুত প্রেত কিংবা কোন অশুভ শক্তি এগুলা আমি বিশ্বাস করি না।হতে পারে এটা কোন মানসিক রোগ।তাছাড়া আমি এতটা চাপের মধ্যে না, যে আমার মস্তিষ্ক বিকারগ্রস্ত হবে।

সিগারাটের ধোঁয়ার কারনে রুমের মধ্যে পুড়া পুড়া গন্ধ ভাব চলে এসেছে।এই পোড়া গন্ধটা কিছু সময় থাকবে তারপর চলে যাবে।বাইরের দৃশ্য স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।পূর্ণিমাতিথি চলছে।ভাবলাম ছাদে গেলে কেমন হয়,এরকম একটা রাতের দৃশ্য হাত ছাড়া করা যাবে না।দরজা খুলে ধীর পায়ে তিন তলার উপরে ছাদে চলে গেলাম।আমি আবার দ্বিতীয় তলার বাসিন্দা,সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠতে তেমন কষ্ট হয় না।

আমি এখন দাঁড়িয়ে আছি সৈয়দ মুজতবা আলী হলের দালানের ছাদের কিনার ঘেঁষে। এটি মৌলভীবাজার সরকারি কলেজের ছাত্রাবাস “সৈয়দ:মুজতবা আলী হল”নামে পরিচিত।হলের ছাদে বসে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়।প্রকৃতি প্রেমীদের জন্য উত্তম একটা স্থান।আমি এখন তাকিয়ে আছি সীমাহীন আকাশ গঙ্গার দূর প্রান্তে। গোলাকার থালার মত চাঁদ ঝুলে আছে আকাশের পশ্চিম কিনারে।
“নিঃস্বার্থে ধরনীর বুকে জ্যোৎস্না বিতরন করছে”
এটা কবির কথা।
কিন্তু আমি বলি ভিন্ন কথা।চাঁদেরও কিন্তু এখানে স্বার্থ আছে। যদি পৃথিবী একবার বলে দেয় ওই চাঁদ তুই আমাকে কেন্দ্র করে ঘুরতে পারবে না, তাহলে বেচারা চাঁদ যাবে কোথায়।আর এজন্য বুঝি তিনি অবলীলায় পৃথিবীর সেবায় নিয়জিত।
আমার চোঁখকে ফাঁকি দেওয়া অতটা সহজ না।তবে এই মুহূর্তে তাকে ধন্যবাদ দেওয়া যায় কেননা তার বিকিরিত আলোর সিহরণে পৃথিবীটাকে তাজা যৌবনময় মনে হচ্ছে।আর আমি এক উদ্ভট একাগ্রচিত্তে ধরনীর যৌবন রূপ উপভোগ করছি।
,
হঠাৎ করে কয়েকটা কুকুর রজনীর নিরবতা ভঙ্গ করে ঘেউ ঘেউ আওয়াজ তুলল।হালকা শীতল সমীরণের প্রবাহ বইতে লাগলো।শরীরটা একটু ঝাকুনি দিয়ে উঠলো।
রাশি রাশি জোছনা শরীরে আচড়ে পড়ছে,পশ্চিম আকাশে অনেক গুলা নক্ষত্র শারীবদ্ধভাবে ঝুলে আছে।উত্তর পশ্চিম কোনে হালকা বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে।
এক পা দুপা করে চাঁদটা এগিয়ে যাচ্ছে আকাশের পশ্চিম প্রান্তে।জ্যোৎস্নার আলো তির্জক ভাবে ভূপৃষ্টে নিক্ষিপ্ত হচ্ছে।এক এক করে দালান গুলির বাতি নিভে যাচ্ছে হয়তো সবাই নিদ্রার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।
রজনী গভীর থেকে গভীরে অগ্রসর মান। পরক্ষনে নৈশ প্রহরীর গর্জন।আবারো নিস্তদ্ধতা ভঙ্গ হল।
দুর থেকে কয়েকটা শিয়ালের হাঁক অস্পট স্বরে ধ্বনিত হল আবার হারিয়ে গেল নির্জন প্রকৃতির বুঁকে।যদিও আশে পাশে কোন চাঁপা ফুলের গাছ নেই তারপরও এক রাশ চাঁপা ফুলের গন্ধ নাসারন্ধ্রে ধাক্ষা দিল।রাত্রে সাধারনতো পক্ষিকোলরা নিরব থাকে,,,,কিন্তু বসন্তে গভীর রজনীতেও কোকিল পাখি কুহু কুহু গান করে।তেমনি একটা কোকিল কুহু কুহু গান তুলল,এবং দুর থেকে আরো একটা কোকিল তার ডাকে সাঁড়া দিল।

প্যাকেটে আর একটি মাত্র সিগারেট আছে।আজকের রাতের শেষ সম্বল বলা যায়।ছাদে বসেই এটি তামাম করবো,আর প্রকৃতিকে কাছে টেনে নেব।গভীর রাতে প্রকৃতি আর আমি একে অপরের সাথে মিশে একাকার হয়ে যাবো।

লাল রঙ্গের একটা টুল রাখা আছে ছাদে,রুদে ঝলসে এবং বৃষ্টিতে ভিজে এটি লাল থেকে সাদা রঙ্গে রুপান্তিরত হচ্ছে।হলের প্রকৃতি প্রেমিকরা এই টুলে বসে বসে প্রকৃতি দেখে,কেউবা আকাশ দেখে।আবার কিছু সৌখিন গায়ক আছেন যারা এই টুলে বসে গলা ছেড়ে গান গায়।

আপন মনে সিগারেট টানতে লাগলাম,কখনো চোঁখ বন্ধ করে কখনোবা আকাশের দিকে চেয়ে।
কি সুন্দর ধোঁয়ার কুন্ডুলি পাক খেতে খেতে প্রকৃতির সাথে মিশে যায়।ঠিক এই ভাবে আমিও যদি পাঁক খেতে খেতে প্রকৃতির সাথে মিশে যেতে পারতাম!
সাথে সাথে একটা দৃশ্য দেখে সটান করে টুল থেকে উঠে পড়লাম।লাফের পর লাফ দিয়ে ছাদ থেকে নেমে রুমে চলে আসলাম।

সিগারেটের ভাসমান ধোঁয়ার মধ্যে আমি তারিনের মুখের অবয়ব দেখতে পেয়েছি।খুবই স্পষ্ট ভাবে চেহারাটা ধোঁয়ার মধ্যে ফুঠে উঠেছে।গভীর রাতে ছাদের উপর এমন দৃশ্য দেখার জন্য প্রস্তুত চিলাম না।কিছুটা ভয় পেয়েছি বটে।হতে পারে ভিজুয়াল হ্যালুসিনেশন হচ্ছে।ভিজুয়াল হ্যালুসিনেশন হচ্ছে এমন কিছু দেখতে পাওয়া বা শুনতে যা আসলে ঘঠছে না।কিন্তু কেন এমন হবে। তাহলে কী আমি জটিল কোন রুগের সম্মুখীন হচ্ছি।খুবই তাড়াতাড়ি একজন সাইকিয়াট্রিস্টের সাথে দেখা করতে হবে।

প্রায় তিন দিন পর সমস্যার সমাধান পেয়ে গেলাম।এখন স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছি। মাথার চাপা যন্ত্রনা কমে গেছে।অদ্ভুত দৃশ্যগুলাও আর দেখছি না।এটাকে রোগ বলা যায় না তবে বড় কোন রোগের সম্মুখীন হওয়ার সম্ভাবনা ছিলো।
আর এই সব কিছুর সুত্রপাত ঘটিয়েছে মাথার পাশে থাকা ছোট টেবিল ফ্যান।আমার চাচাতো ভাই সালমান একটু বিজ্ঞানী টাইপের। যে কোন বিষয় নিয়ে তুমুল ঝগড়াঝাঁটি শুরু করবে।তো সেদিন শুরু হয়েছিলো শব্দ ও শব্দের শ্রাব্যতার সীমা নিয়ে বিতর্ক।আমরা বিভিন্ন হার্জের শব্দ নিয়ে তর্ক করছিলাম।হঠাৎ করে আমার টেবিল ফ্যানের দিকে সন্দেহের তীর চলে গেল।সন্দেহের দানাটা বেঁধেছে উনিশ হার্জের একটা শব্দ তরঙ্গ নিয়ে।মানুষের শ্রাব্যতার সীমা সর্বনিম্ন ২০ হার্জ। অর্থাৎ এর চেয়ে কম হার্জের শব্দ মানুষ শুনতে পায় না।কিন্তু উনিশ হার্জের শব্দটা বিশ হার্জের শব্দের খুব কাছাকাছি থাকায় শব্দটা আমরা শুনতে পারি না ঠিকিই কিন্তু আমাদের মম্তিষ্কে ঠিকিই ধরা দেয়।মস্তিষ্কে সৃষ্টি করে চাপা যন্ত্রনা।স্বাভাবিক চিন্তাধারায় বিঘ্ন ঘটায়।এতে ঘটতে পারে হেলোসিনেশন।মস্তিষ্কে সৃষ্টি হয় অদৃশ্য কথোপকথন।তাছাড়া অস্বাভাবিক দৃশ্যের সৃষ্টি করে যা বাস্তব বলে মনে হয় কিন্তু বাস্তব না।সব কিছু মস্তিষ্কের ধোঁকা।

হঠাৎ করে হাতে একটা যন্ত্র নিয়ে সালমান রুমে প্রবেশ করলো।ও এতটা পাগলাটে হতে পারে
আমার জানা ছিলো না।টেবিল ফ্যান থেকে আসলেই কি উনিশ হার্জের শব্দ তরঙ্গ বের হচ্ছে সেটা পরীক্ষা করার জন্য শব্দের কম্পাঙ্ক নির্ণয়ের জন্য সনোমিটার নিয়ে এসেছে।

পরীক্ষা শেষে সালমান অবাক দৃষ্টিতে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে।
–আমি বললাম কী হয়েছে?
–এমন ভাবে থাকিয়ে আছিস কেন?

–উত্তেজিত স্বরে বলল-
–ভাই আপনার আইডিয়া শক্তি তো দারুন।সত্যিই তো ফ্যান থেকে উনিশ হার্জের শব্দ তরঙ্গ বের হচ্ছে।

——–সমাপ্ত

লেখক: মাহফুজুর রহমান

অদৃশ্য আওয়াজ (পর্ব ১)

আর্নেস্ট হোমিংয়ের “দ্যা ওল্ড ম্যান এড দ্যা সী” বইটি পড়তে বসেছিলাম।কিন্তু ঘুমে চোখ এতোটাই ভারী হয়ে আছে,মনে হচ্ছে চোখের অক্ষি কোটর থেকে বেরিয়ে আসবে।

হঠাৎ করে শুনতে পেলাম,কে যেন বিড় বিড়  করে কিছু একটা বলছে আমাকে।কন্ঠস্বর টা অনেক বড়,পুরুষালি কন্ঠ।কি বলা হয়েছে সেটা আমি ধরতে পারি নি।যেহেতু রুমে কেউ নেই,তাই হতে পারে আওয়াজটা বাইরে থেকে এসেছে।ধাক্কা দিয়ে দরজা খুললাম,কিন্তু বাইরে কেউ নেই।হতে পারে এটা ক্লান্ত মস্তিষ্কের অবচেতন কল্পনা।

প্রায় মধ্যরাত হয়ে গেছে-এই সময় আমার সাধারণত ঘুম আসে না।আর যদি খুব বেশি ঘুম পায় তাহলে সেটা সারা রাত না ঘুমানোর লক্ষণ।প্রায়ই এরকম হয়।চোখে প্রচন্ড ঘুমের চাপ থাকে,কিন্তু ঘুম আসে না।তারপরও ঘুমানোর জন্য প্রস্তুতি নিলাম।এক গ্লাস পানি পান করে, মশারি টানিয়ে বিছানায় গেলাম।ফাল্গুন মাস প্রায় শেষের দিকে,আজকে তাপমাত্রা অনেক বেশি।প্রচন্ড গরম অনুভব করছি।মশার নির্যাতন থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য মশারি টানিয়েছি।মাথার পেছনের চেয়ারে একটা টেবিল ফ্যান ও রাখা আছে।কিন্ত মশারির ভেতরে পর্যাপ্ত বাতাস প্রবাহিত হচ্ছে না।ফ্যানটাও আকারে অনেক ছোট।

মশারির উপরের দিকটা ঢিলা হয়ে অনেকটা ঝুলে আছে,প্রায় শরীর ছোঁই ছোঁই অবস্থা।তারপরও আমার শরীর থেকে দুই ইঞ্চি উপরে মশারির অবস্থান।তার মানে এই দাঁড়ালো- মশারিতে বসে যদি মশা আমার শরীরে সুঁচ ফোটাতে চায়,তাহলে তার দুই ইঞ্চি লম্বা সুঁচের দরকার।যেহেতু মশার এতো লম্বা সুঁচ নেই,তাহলে নিশ্চিন্তে ঘুমানো যায়।প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট ধরে ঘুমানোর চেষ্টা করছি কিন্তু ঘুম আসছে না।ঘুম আসার যতোরকম কায়দা আছে সবক’টা অনুসরণ করতে লাগলাম।

যেমন –
একশো থেকে উল্টো গুণে গুণে এক পর্যন্ত আসতে হবে।এতে যদি কাজ না হয় তাহলে চোখ বন্ধ করে বৃত্ত কল্পনা করতে হবে এবং সেগুলা ভরাট করতে হবে।বিশেষজ্ঞদের মতে এরকম পদ্ধতি অনুসরণ করলে মস্তিষ্ক ক্লান্ত হয় এবং  তাড়াতাড়ি ঘুম চলে আসে।কিন্তু আমার ক্ষেত্রে ঘটলো তার উল্টোটা।চোখের ঘুম যা ছিলো সব চলে গেছে।বিশেষজ্ঞরা বলেছেন একশো থেকে উল্টো গুণতে হবে।আমি ভাবলাম দুইশো থেকে গুণলে সমস্যা কি?এক গুণায় ঘুম চলে আসবে।কিন্তু কিছুক্ষণ পরপর সংখ্যায় তালগোল পাঁকিয়ে ফেলছি।ভাবলাম শুয়ে শুয়ে সঠিক ভাবে গণনা করা সম্ভব নয়।তাই উঠে বসে পুনরায় গণনা শুরু করলাম।গণনা ঠিকই হয়েছে কিন্তু ঘুম বেচারা পুরোটা উধাও হয়ে গিয়েছে।তাই ভাবলাম “দ্যা ওল্ড ম্যান এন্ড দ্যা সী ” বইটি নিয়ে আবার বসা যাক।

বিছানা থেকে উঠতেই বিদ্যুৎ চলে গেলো।সচরাচর এখানে লোডশেডিং হয় না।হয়তো আবহাওয়ার অবস্থা খারাপ।ফাল্গুন মাসেও বজ্রের ডামা-ঢোল বাজিয়ে বৃষ্টি হওয়াটা অবাস্তব কিছু না।পূর্বপাশের জানালাটা খুলে দিলাম।বাইরে চাঁদের জোছনা মিটিমিটি করছে।আকাশে তারা গুলো জ্বলজ্বল করছে।অর্থাৎ বৃষ্টির কোনো লক্ষণ নেই।হয়তো অন্যকোনো কারণে লোডশেডিং হয়েছে।ফ্যান বন্ধ হওয়ায় মশার উৎপাত বেড়ে গেলো।তাই আবারো বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়লাম।

মশারিটা মুখ থেকে প্রায় তিন ইঞ্চি উপরে ঝুলে আছে।মনে হচ্ছে প্রায় ডজনখানেক মশা সেখানে বসে ননস্টপ সংগীত পরিবেশন করছে।এই গান আর থামবে বলে মনে হয় না।ভন ভন  আওয়াজে কানটা একেবারে জ্বালা-পালা হয়ে যাচ্ছে।আমি নাছোড়বান্দার মতো বিছানায় পড়ে আছি প্রতিবাদ করার মতো কোনো অস্ত্র আমার কাছে নেই।তাছাড়া আমার অর্থনীতির স্যার বলেছেন মশা মারলে নাকি বেকারত্ব বৃদ্ধি পাবে।যদি সব মশা মেরে ফেলা হয় তাহলে কয়েল কোম্পানিতে ধ্বস নামবে,মশারি কোম্পানিতে ধ্বস নামবে।কোম্পানি গুলো আর শ্রমিক নিয়োগ দেবে না।তাতে বেকারত্বের হার বাড়তে থাকবে।দেশের বৃহৎ স্বার্থের কথা চিন্তা করে মশার উপর পাল্টা আক্রমণ করলাম না।তবে রক্ষণাত্বক ভঙ্গিতে ওদের সাথে মোকাবেলা করা যায়।

দুই হাত দিয়ে দুই কান চেপে ধরলাম,তারপর চোখ বন্ধ করে শুয়ে পড়লাম।কিন্তু এভাবে কতোক্ষণ থাকবো,প্রায় পাঁচ মিনিট পরে হাল ছেড়ে দিলাম।এবার মনে হচ্ছে শব্দ এবং স্বর ঠিকই আছে কিন্তু সংগীতের তাল পরিবর্তন হয়েছে।অনেকটা এরকম- ভন—–ভন—–ভনভন—–ভনভন—- ভন।
মনে হচ্ছে ওরা রবীন্দ্র সংগীত পরিবেশন করছে।পীথাগোরাস বলেছিলেন সবকিছুর মধ্যে সংগীত নিহিত রয়েছে।তাই তিনি গণিতের মধ্যে ও সংগীত খোঁজে পেয়েছেন।আইনস্টাইন তো পিয়ানোর সুরের মধ্যে ঈশ্বরের অস্তিত্ব খোঁজে পেতেন।এই দিক বিবেচনা করলে মশার ভন ভন আওয়াজে রবীন্দ্র সংগীত খোঁজে পাওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু না।

এক ঝটকায় বিছানা থেকে উঠে পূর্ব দিকের জানালার পাশে গিয়ে বসলাম।আবাসিক হল থাকার কারণে রুমটা অনেক বড়।রুমের চার কোণায় চারটি বেড এবং চারটি টেবিল আছে।রুমের বাকি তিনজন মুসাফিরের মতো ওরা শুধু পরীক্ষার সময় আসে তারপর আবার উধাও।সবসময় রুমে একা থাকতে হয়।কথা বলার মতো কেউ নেই।তাই বলে কি আমার কথা বলা বন্ধ? দেয়ালের সাথে কথা বলি, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলি।কখনো আয়নার দিকে তাকিয়ে ডেল কার্নেগির মতো বক্তব্য দেওয়ার চেষ্টা করি,মাঝে মধ্যে রোহান এটকিনসনের মতো নানারকম ভঙ্গিতে মুখ ভেংচিয়ে নিজেকে হাসানোর চেষ্টা করি।আয়নায় ফুটে ওঠা নিজের অদ্ভূত অঙ্গসঞ্চালন বিদ্যা দেখে কিছুটা অবাক হই।আফসোস করে বলি-সব কিছু ছেড়ে যদি অভিনয় বিদ্যাটা রপ্ত করতে পারতাম!

যাই হোক বিভিন্ন ভাবে নিজেকে খুশি রাখার চেষ্টা করি।তবে একজন মায়াবতীর মায়ায় পড়ে গিয়েছিলাম।এক সময় আবিষ্কার করতে পারলাম আমার হাসি কান্না অনেকটা ওর উপর নির্ভর করে।সে হাসলে আমি হাসি,সে কাঁদলে আমি কাঁদি।
-কিন্তু কেন?
-আমার হাসি কান্না কেন অন্যকেউর উপর নির্ভর করবে?নিজেকে প্রশ্ন করলাম।
-আমার সুখ-দুঃখের নিয়ন্ত্রক কেন অন্য কেউ হবে?।
তারপর নিজের সাথে সংগ্রাম করে সেই মায়াজাল ছিঁড়ে বেরিয়ে আসলাম।

তবে সেই মায়াবতী কী জানতো কেউ একজন তার মায়ায় আটকা পড়েছিল,এবং তার অজান্তেই সেই মায়াজাল ছিঁড়ে বেরিয়ে গেছে।

-হয়তো জানে না।অনেক কিছুই আছে যা অজানা থেকে যায়।অনেক রহস্যই আছে যা উদঘাটন করা যায় না।

জানালার সবকটা পার্ট খুলে দিলাম।রাশি রাশি জোছনায় গা ভাসিয়ে দিতে ইচ্ছে করছে,কিন্তু চাঁদটা মধ্য আকাশ পেরিয়ে পশ্চিম প্রান্তে ঢলে পড়ছে।তাই তির্যকভাবে রুমে আলো প্রবেশ করতে পারছে না।কারন জানালাটা পূর্ব প্রান্তেই ছিল।তারপরও অন্ধকার রুমে জোছনা গুচ্ছ লুটুপুটি খাচ্ছে।এমন একটা পরিবেশে যদি হাতে একটা জলন্ত সিগারেট থাকে, তাহলে তো কথাই নেই। পকেটে মাত্র দুটি সিগারেট আছে, এখন একটা এবং শেষ রাতে একটা। খেল খতম।
দেশলাই এর পুড়া গন্ধটা নাকের মধ্যে জোরালো ধাক্ষা দিলো।এই গন্ধটা আমার অনেক ভালো লাগে।বাঁকা ঠোঁটে সিগারেটে তৃপ্তির টান দিয়ে এক গাল ধোঁয়া নাসারন্ধ্র দিয়ে নিক্ষেপ করলাম।ধোঁয়ার কুন্ডুলি পাঁক খেতে খেতে হাওয়ায় মিশে গেল।চোখ বন্ধ করে বড় করে তৃপ্তির নিঃশ্বাস নিলাম।
হঠাৎ করে স্পষ্ট স্বরে মৃদু হাসির শব্দ শুনতে পেলাম।একটা মেয়ের হাসি,খুবই মিষ্টি স্বরে হাসছে।এই হাসি আমার অনেক পরিচিত।এই হাসিটা সেই ময়াবতীর হাসি।
এবার একটু নড়েচড়ে বসলাম।কিছু একটা গোলমেল তো হচ্ছে।

হাসির শব্দটা খুবই স্পষ্ট ভাবে শুনলাম।মনে হচ্ছে মস্তিষ্কের ভেতর থেকে শব্দটা বের হচ্ছে।গত কদিন ধরে মাথার মধ্যে চাপা যন্ত্রনা অনুভব করছিলাম।সব কিছুর পেছনে কোন না কোন যুক্তি আছে,আমি এটা বিশ্বাস করি।এই ঘটনার পেছনেও কোন যুক্তি আছে সেটা আমাকে খুঁজে বের করতে হবে।তার মানে বিড়্ বিড়্ করে পুরুষালি কন্ঠে যে আওয়াজটা শুনেছিলাম সেটা আমার মস্তিষ্কের ভুল ছিল না।রাত প্রায় দুটো বাজে,আর কোন দিন এরকম পরিস্থিতির সম্মুখিন না হওয়ায় কিছুটা ভয় পেয়ে গেলাম।যদিও যুক্তি দিয়ে ভয় কে জয় করা যায় কিন্তু এর পেছনে শক্তিশালি যুক্তি প্রয়োজন।তবে শুনেছি পাগলরা নাকি এরকম অদ্ভুত কিছু শুনে,অদ্ভুত কিছু দেখে।ভয়ে কাতর ভঙ্গিতে জরসর হয়ে ঘরের কোনে বসে থাকে।অনেকে আবার বিভিন্ন ধরনের কথা বলে,বিশেষ কোন বিষয়কে নির্দেশ করে।কেউ আবার অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে,ভয়ংকর ভঙ্গিতে অট্রহাসি দেয়।আবার আরেক শ্রেণীর পাগল আছে যারা এক যায়গায় স্থির হয়ে বসে থাকে এবং এক দৃষ্টিতে কোন কিছুর দিকে তাকিয়ে থাকে।

,,,,চলবে

লেখক- মাহফুজুর রহমান

প্যারানর্মাল সাইকোলজি বা প্যারাসাইকোলজি কি?

এমনিতে প্যারানর্মাল বলে তাকেই যা কিনা আমাদের স্বাভাবিক বা নর্মাল যুক্তিগ্রাহ্য অভিজ্ঞতা বা বিজ্ঞান দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।অর্থাৎ সোজা কথায় বলতে গেলে নানারকম ভূতুড়ে বা অদ্ভুতুড়ে কাণ্ডকারখানা, এক্সট্রাটেরেস্ট্রিয়াল জিনিসপত্তরই প্যারানর্মালের বিষয়বস্তু।আর এটাই হচ্ছে প্যারানর্মাল সাইকোলজি বা প্যারাসাইকোলজির চর্চার বিষয়।টেলিপ্যাথি থেকে শুরু করে ভবিষ্যতের জিনিস দেখতে পাওয়া,সাইকোকাইনেসিস বা বিশেষ ক্ষমতার বলে মানুষের শরীরকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা,পুনর্জন্ম বা আদৌ পুনর্জন্ম বলে কিছু হয় কিনা,এমনকি মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মানুষ যে সমস্ত অদ্ভুত অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়—সেটাই প্যারাসাইকোলজির বিষয়বস্তু।

প্যারাসাইকোলজি ও বিজ্ঞান

ওপরে যে জিনিসগুলোর কথা বললাম,আমাদের বৈজ্ঞানিক যুক্তি-বুদ্ধিওয়ালা মন দিয়ে কিন্তু তার একটারও ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে না।উল্টে বিজ্ঞান এগুলোকে অস্বীকারই করে।আর বিজ্ঞান যেগুলোকে অস্বীকার করে আজগুবি বলে উড়িয়ে দেয়,প্যারাসাইকোলজি সেটাকেই একভাবে স্বীকার করে নিয়ে তাকে তার চর্চার ক্ষেত্র করে তুলেছে।

প্যারাসাইকোলজি ও মেইন স্ট্রিম পড়াশোনা

প্যারাসাইকোলজি চর্চার শুরু কিন্তু নিতান্তই হাল আমলে।মোটামুটি ১৮৫৩ সালে রবার্ট হেয়ার প্রথম প্যারাসাইকোলজি নিয়ে গবেষণা করেন।এরপর যত দিন গেছে,এই নিয়ে চর্চার আগ্রহ মানুষের বেড়েছে।আর ভূত,অদ্ভুত নিয়ে মানুষের আগ্রহ তো চিরকালীন।যা সে জানে না,যার ব্যাখ্যা সে পায় না,তাকেই তো সে নানাভাবে জানতে,ভাবতে চায়।তাই যত দিন গেছে ভূতুড়ে-অদ্ভুতুড়ের মিশেলে এই প্যারাসাইকোলজিতে মানুষ নানা ভাবে মজেছে। তবে হ্যাঁ,মেইনস্ট্রিম বিজ্ঞানের শাখা যাকে বলে,তাতে কিন্তু প্যারাসাইকোলজি কোনোদিনই স্থান পায়নি।মানুষ বরং একে খানিক সন্দেহের দৃষ্টিতেই দেখে এসেছে।তাই মেইনস্ট্রিম বিজ্ঞানের চর্চায়, বিশ্ববিদ্যালয়ে কখনও প্যারাসাইকোলজি বিষয় হিসেবে স্থান পায়নি।এই নিয়ে যা টুকটাক কাজ,গবেষণা হয়েছে,সবই ব্যক্তিগত উদ্যোগে।আর সন্দেহের কারণও আছে।কারণ আজ পর্যন্ত এই প্যারাসাইকোলজি চর্চার ক্ষেত্রে ভুয়ো জিনিসপত্রের,ভাঁওতাবাজির অভাব হয়নি।ফ্রডনেসের দায়ে ধরা পড়েছেন একাধিক মানুষ।

তাই নানা অবিশ্বাস্য জিনিসের প্রতি যদি আপনার আগ্রহ থেকে থাকে, তাহলে কিন্তু প্যারাসাইকোলজি বা প্যারানর্মাল সাইকোলজিতে আপনি একজন রীতিমতো বিশেষজ্ঞ হয়ে ওঠার কথা ভাবতেই পারেন।নাই বা থাকলো সিলেবাস আর প্রথাগত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা।বইপত্র আর বিশেষজ্ঞের তো অভাব নেই।

তাই বলে বলা তো যায় না।আপনিই হয়তো প্যারাসাইকোলজির কোনো এক বিশেষ তত্ত্ব আবিষ্কার করে ফেললেন।তাই আগ্রহ থাকলে কিন্তু প্যারানর্মাল সাইকোলজি চর্চার কথা আপনিও ভেবে ফেলতেই পারেন।